আমি আর আমার গার্লফ্রেন্ডস

আমি আর আমার গার্লফ্রেন্ডস - না, কোনও পুরুষ বলছেন না। বলছেন তিন মহিলা - স্বস্তিকা মুখার্জ্জী, রাইমা সেন আর পার্ণো মিত্র। একজনের অন্য দুজন। ভাবছেন হচ্ছেটা টা কী! কিছুই না। হচ্ছে সিনেমা। পরিচালনায় মৈনাক ভৌমিক। তিন নায়িকা স্বস্তিকা,রাইমা এবং পার্ণো। তিন মেয়ের একজন লেখিকা, একজন রেডিও জকি আর একজন করেন কাউন্সেলিং। তিনজন বেড়াতে যান একসঙ্গে আর তারপর বাকীটা তাঁদের একে অপরের এক্সপেরিয়েন্স শেয়ার করার গল্প।

মৈনাক ভৌমিকের আমি আর আমার গার্লফ্রেন্ডস একটি সমকালীন ছবি যেখানে গার্লস রক। আর আমি আর আমার গার্লফেন্ডস-য়ের তিন মেয়ে শ্রীময়ী (স্বস্তিকা), রিয়া (পার্নো), এবং প্রণীতা (রাইমা) এই সময়ের যে কোনও বড় শহরের তিনটি মেয়ে হতে পারে। সে শহর নিউইয়র্ক কিংবা মুম্বই কিংবা কলকাতা। সত্যি বলতে মেট্রো শহরগুলোর মেয়েরা এখন এ রকমই। ঠিক যেমনটি দেখলাম আমরা শ্রীময়ী, রিয়া ও প্রণীতাকে। দেখলাম আর স্বস্তি পেলাম।

আমি আর আমার গার্লফ্রেন্ডস নিরীহ ঘটনার পর্যবেক্ষক হয়েই থেকে যায়। শ্রীময়ীর জীবনে এসে পড়ে ষোলো-সতেরোর বালক। শ্রীময়ী তাকে গ্রহণ করে মন, মনন, বেদন, পরিবেদনার তোয়াক্কা না করেই। রিয়া যাকেই দেখে, তার সঙ্গেই বিবাহ করিডরে হাঁটার জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠে। প্রণীতা তথাকথিত চিন্তনশীল লেখক হয়েও আশ্রয়প্রার্থী হয় এক এক নামগোত্রহীন চ্যাট ফ্রেন্ডের।



শ্রীময়ী, রিয়া, প্রণীতারা গার্লস নাইট আউট করে, কফিশপে বসে ক্লান্ত আড্ডা দেয়, মন্দারমণির বিচে বিকিনি পরে জলকেলি করে। সম্ভবত প্রেম এবং সেক্সহীনতাই তাদের জীবনের একমাত্র বিপন্নতার জায়গা। একমাত্র এই মেয়েরা পরস্পরের সান্নিধ্যে কিছুটা উচ্ছল, কিছুটা প্রাণবন্ত। বাকি সময়টা প্রণীতা কিংবা শ্রীময়ীকে লাগে হতাশ ও প্রাণহীন।

হয়তো মৈনাক এই ছবির মধ্যে দিয়ে সেই বাস্তবতাকেই ধরতে চেয়েছেন যেখানে ক্রমশই মেয়েরা সাহচর্যের জন্য মেয়েদেরই দ্বারস্থ হচ্ছে, ক্রমশ একটা মেয়ে একটা মেয়ের কাছেই খুঁজে পাচ্ছে সহানুভূতিশীল তত্ত্বাবধান। এই আধুনিক পৃথিবীর মেয়েরা ক্রমশই এত মানসিক সাবালকত্ব অর্জন করছে যে পুরুষরা তাদের কাছে সেই তুলনায় হয়ে উঠছে অপরিণত মস্তিষ্ক। খেলার সামগ্রী। ছেলেমানুষ। সেই কারণেই হয়তো শ্রীময়ীর কাছে তার স্বামী এবং হাঁটুর বয়সি ছাত্রের আবেদন একই।

আমি আর আমার গার্লফ্রেন্ডস’ সব মিলিয়ে বেশ একটা ঝকঝকে স্মার্ট ছবি। এতটাই স্মার্ট যে আমাদের গর্ব হতে পারে। যদিও মৈনাকের ‘বেডরুম’ দেখার পর এই ছবিটার ক্ষেত্রে যে যে প্রত্যাশাগুলো তৈরি হয়েছিল, বলা বাহুল্য ছবিটা প্রত্যাশার সেই উচ্চতায় উঠতে পারেনি। হতে পারে যে ছবিতে এই সময়ের মেয়েদের যৌবনের বাঁধনহারা উচ্ছ্বাস আর আশা আকাঙ্ক্ষাকে কুর্নিশ করা হয়েছে, উদ্যাপন করা হয়েছে। কিন্তু বিহ্বল হয়ে পড়ার বা মায়াবি মুহূর্ত খুঁজে পাওয়ার একটা ইচ্ছেও তো দর্শকের থাকে।

ছবিতে মৈনাকের নায়িকাদের অভিনয় সম্পর্কে যত প্রশংসাই করা হোক, কম। স্বস্তিকার অভিনয়ের নির্যাসে শ্রীময়ী চরিত্রটি একটা তুলনাহীন চরিত্র হয়ে থাকবে বাংলা সিনেমায়। একটু সরল, একটু বোকা, যখন তখন প্রেমে পড়তে চাওয়া পার্নো (রিয়া) যেন ভীষণ চেনা! রাইমা ধীরে ধীরে আরও বিশ্বাসযোগ্য ও গভীরমনস্ক অভিনেত্রী হয়ে উঠছেন। সংশয়াতীত ভাবে যিনি নিজের অভিনয় দিয়ে এই সমকালীনতাকে অন্য এক মাত্রা দিয়ে গেলেন, তিনি বিশ্বনাথ।
মৈনাকের চিত্রনাট্য অতি বুদ্ধিদীপ্ত, প্রগলভ, বিপুল রূপে চলমান।

ব্যঙ্গ, বিদ্রুপ, পরিহাসমুখর, জমজমাট ছবি। আমি আর আমার গার্লফ্রেন্ডস এর ক্যামেরাও ততখানি স্বতঃস্ফূর্ত। নীল দত্তের মিউজিকেও এই সময়ের ডামাডোলের প্রভাব। সদর্থেই এই সময়ের মেয়েদের নিয়ে নিজের মতো করে একটা সেলিব্রেশনই ঘটিয়েছেন মৈনাক।